উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি মতলব উত্তরে ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রে : নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে হুমকির মুখে পর্যটনটি

সফিকুল ইসলাম রানা। মেঘনা নদীর পাড় ঘেঁষে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়ানো চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রটি আজ উন্নয়ন ও তদারকির অভাবে ধুঁকছে। ২০০০ সালে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা কার্যকর ব্যবস্থাপনার ছোঁয়া লাগেনি এখানে।

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, নদীর মনোরম পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থান ষাটনলকে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে পারত। কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে সেই সম্ভাবনা আজ প্রায় বিলীন। চলতি বছরে মাত্র দুটি পুরোনো টিনের ছাউনি মেরামত করা হলেও তা মোটেও পর্যটকদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়। পর্যটন কেন্দ্রের অভ্যন্তরে কোনো আধুনিক সুবিধা নেই, নেই উন্নত বিশ্রামাগার, শৌচাগার, নিরাপদ খাবার ব্যবস্থা বা পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণে ষাটনল তার আকর্ষণ হারাতে বসেছে। সন্ধ্যার পরপরই মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে, যা পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার বড় শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীরবর্তী পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবার দূরদূরান্ত থেকে বহু পর্যটক এখানে আসেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু ন্যূনতম সুবিধার অভাবে তাদের হতাশ হয়ে ফিরতে হয়। পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চল পর্যটন মানচিত্রে অবহেলিত রয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিয়ে ষাটনলকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। তাদের মতে, এ পর্যটনকেন্দ্র চালু হলে এলাকাবাসীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, জমির দাম বাড়বে, দোকানপাট ও বাজার গড়ে উঠবে। ষাটনলের উন্নয়ন পুরো এলাকাকে নগরায়নের দিকে এগিয়ে নিতে পারত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সচেতনতার মাধ্যমে ষাটনলকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় অংশগ্রহণের সমন্বয় ঘটাতে পারলে চাঁদপুরের ষাটনল একদিন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে এমনটাই আশা করছেন স্থানীয়রা।
পর্যটক মাহমুদ হাসান বলেন, ষাটনলের প্রকৃতি অসাধারণ। নদীর পাড়ে বসে সময় কাটানোর অনুভূতি দুর্দান্ত। কিন্তু এখানে পর্যটকদের জন্য কোনো সুব্যবস্থা নেই। বিশ্রামের জায়গা, টয়লেট সুবিধা, খাবারের দোকান কিছুই ঠিকঠাক নেই। এত সুন্দর জায়গা এভাবে অবহেলিত দেখে খারাপ লাগে।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সুমাইয়া আক্তার বলেন, বন্ধুদের সাথে ভ্রমণে এসেছিলাম। জায়গাটা দারুণ, কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টা নিয়ে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন ছিলাম। সন্ধ্যার পর চারপাশে কিছু সন্দেহজনক মানুষের আনাগোনা দেখে ভয় লাগছিল। যদি সরকার একটু নজর দিত, তাহলে এটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠত।

স্থানীয় পর্যটক কামরুল ইসলাম বলেন, আমি প্রায়ই এখানে আসি, বিশেষ করে ছুটির দিনে। কিন্তু নৌকাভ্রমণ ও নদীর ঢেউ দেখা ছাড়া আর কোনো সুযোগ নেই। যদি ভালো রেস্ট হাউজ, খাবার দোকান আর সুরক্ষিত পরিবেশ থাকত, তাহলে এখানে অনেক পর্যটক আসত। এতে স্থানীয় মানুষজনেরও অনেক লাভ হতো।

স্কুল শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন বলেন,আমরা বন্ধুদের সাথে স্কুল ছুটির পরে এখানে ঘুরতে আসি। নদীর পাড়ে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু এখানে বসার জায়গা নেই। যদি সুন্দর একটা পার্ক তাহলে আমরা আরও মজা করতে পারতাম। স্কুলের ছুটির দিনে অনেক ছাত্রছাত্রী আসত।

স্থানীয় সংবাদকর্মী শামসুজ্জামান ডলার বলেন, ষাটনলপর্যটন কেন্দ্রের সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি নজরদারির অভাবে এটি আজ প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। আমরা বারবার প্রতিবেদনে এই এলাকার সমস্যা তুলে ধরেছি। অবৈধ বালু উত্তোলন, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা আর অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে পর্যটকের সংখ্যা যেমন কমছে, তেমনি এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নও আটকে আছে। সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।

ষাটনল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম সরকার বলেন, ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র আমাদের ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের একটি মেরুদন্ড হতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতরকে মৌখিকভাবে অবহিত করেছি, উপজেলা পরিষদে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করছি। এই প্রকল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পার্কিং এলাকা, পরিবারের জন্য ছাওয়া, শিশুদের খেলাধুলার সুবিধা এবং সুষম বায়ো-রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আশা করছি, সরকারি বরাদ্দ ও জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় অতি শীঘ্রই কাজ শুরু করতে পারব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়ন আমাদের প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যটন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বয় সভা করেছি। অদূর ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আশা করছি জেলা প্রশাসক বরাবর অনুমোদন পাওয়ার পর এ বছরের মধ্যেই কাজ শুরুর নির্দেশনা প্রদান করা হবে।

প্রকাশ :   মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৫ খ্রি.

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

Views: 0

শেয়ার করুন