বই: মস্তিষ্কের ব্যায়ামাগার, মনের আশ্রয় আর সভ্যতার আয়না

বই হলো জ্ঞান, ইতিহাস ও কল্পনার এক অমূল্য ভাণ্ডার, যা কাগজের পৃষ্ঠা বা ডিজিটালি (ইবুক) সংরক্ষিত থাকে।এটি মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির এক অনন্য কারিগর। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস স্মৃতিশক্তিকে ধারালো করে এবং দ্রুত মানসিক চাপ কমায়। যারা বইয়ের পাতায় মিশে থাকা পুরনো সুবাস ভালোবাসেন, তাদের এই ভালো লাগাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘বিবলোসমিয়া’। অন্যদিকে, বর্তমানের ব্যস্ত সময়ে বই থেকে দূরে ছিটকে পড়ার ভয় কাজ করে, তাকে বলা হয় ‘অ্যাবিবলিওফোবিয়া’। এই দুই মেরুর মাঝে গড়ে উঠেছে বিশ্বের প্রায় ১২ কোটিরও বেশি বইয়ের এক বিশাল ভাণ্ডার। বইয়ের ইতিহাস সুদীর্ঘ, এর সাথে জড়িয়ে থাকা তথ্যগুলো রোমাঞ্চকর। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে এমন ৪টি বই সংরক্ষিত আছে, যেগুলোর মলাট মানুষের চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা।

ঐতিহাসিকভাবে একে বলা হয় ‘অ্যানথ্রোপোডার্মিক বিবিলিওপেজি’। আবার ব্রাজিলের সরকার কারাগারে বন্দীদের সংশোধনের জন্য এক অনন্য পদ্ধতি বেছে নিয়েছে; একটি বই পড়ে সফলভাবে তার রিভিউ বা পর্যালোচনা জমা দিতে পারলে বন্দীর সাজা থেকে ৪ দিন মওকুফ করা হয়। বই যে মানুষকে অপরাধের অন্ধকার থেকে সুপথে ফেরাতে পারে, এটি তার বড় প্রমাণ।বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদিত বইয়ের ৬৮% কেনেন নারীরা। এছাড়া সাহিত্যের জগতেও রয়েছে বিচিত্র সব রেকর্ড। ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’-এ ৮২৩ শব্দের একটি অত্যন্ত দীর্ঘ বাক্য রয়েছে, যা পড়ার সময় রীতিমতো দম আটকে আসার উপক্রম হয়। মুদ্রণ প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় প্রথম টাইপরাইটারে লেখা বই হিসেবে নাম লিখিয়েছিল মার্ক টোয়েনের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব টম সয়্যার’।বর্তমান বিশ্বে বই পড়ার হারে দেশভেদে ব্যাপক তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।বই পড়ায় বর্তমানে বিশ্বে এক নম্বর স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

একজন মার্কিন নাগরিক বছরে গড়ে ১৭টি বই পড়েন। এর পরেই রয়েছে ভারত, যেখানে পাঠকরা বছরে গড়ে ১৬টি বই শেষ করেন।তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য।যুক্তরাজ্যে পাঠকরা বছরে গড়ে ১০ থেকে ১৫টি বই পড়েন। যুক্তরাজ্যের একজন নাগরিক সপ্তাহে গড়ে সাড়ে ৬ ঘণ্টা বই পড়েন।যৌথভাবে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফ্রান্স ও ইতালি । একজন ফ্রান্সের নাগরিক বছরে গড়ে ১৪ টি বই পড়ে এবং একজন ইতালির নাগরিক বছর গড়ে ১৩ টি বই পড়ে।অন্যদিকে, ১০২টি দেশের মধ্যে বই পড়ার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। বাংলাদেশের নাগরিকরা বছরে গড়ে ৩টিরও কম বই পড়েন।৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে চীনে ‘হীরক সূত্র’ কাঠের ব্লকে ছাপানো হয়েছিল।

এটিকে বিশ্বের প্রথম মুদ্রিত বই বলা হয়।প্রাচীন ব্যাবিলনীয়,রোমান,প্রাচীন গ্রিস মিশর থেকে আমদানিকৃত প্যাপিরাস নামক নলখাগড়া থেকে তৈরি কাগজের স্ক্রল বা কুণ্ডলী ব্যবহার করে বিভিন্ন সাহিত্য ও শিল্পকলার বই লিখতো।প্রাচীন মিশরের লোকজন গনিতসহ বিভিন্ন বিদ্যা নিয়ে বই লিখতো।বইয়ের আধুনিক যুগের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৪৫৫ সালে ইয়োহানেস গুটেনবার্গের ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’ মুদ্রণের মাধ্যমে।এটি বিশ্বের প্রথম মুদ্রিত বই নয়।বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মুদ্রণ যন্ত্রে পূর্ণাঙ্গ আরবি কোরআন মুদ্রিত হয় ইতালির ভেনিস শহরে।সময়কাল ছিল ১৫৩৭ থেকে ১৫৩৮ সালের মধ্যে।ভেনিসের মুদ্রাকর পাগানিনো পাগানিনি এটি মুদ্রণ করেন।এটি মূলত উসমানী সাম্রাজ্যে বর্তমান তুরস্ক ও প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোতে রপ্তানির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

প্রচুর বানান ও ব্যাকরণগত ভুল থাকায় উসমানী সাম্রাজ্যে এটি তখন গ্রহণ করা হয়নি। দীর্ঘকাল পবিত্র কোরআনের মুদ্রিত সংস্করণগুলো হারিয়ে গেছে বলে প্রত্যেকে ধারণা করলেও ১৯৮৭ সালে ভেনিসের খ্রিষ্টানদের লাইব্রেরিতে এর একটি কপি খুঁজে পাওয়া যায়।বর্তমানে ইতালির ভেনিসে অবস্থিত ফ্রান্সিসকান খ্রিষ্টান সন্ন্যাসীদের ‘সান মিশেল ইন ইসোলা’ লাইব্রেরিতে বিশ্বের প্রথম মুদ্রণ কোরআন সংরক্ষিত রয়েছে।১১৫০ সালে মুসলিম শাসিত স্পেনে কাগজ তৈরি শুরু হয়। ১৪৫০ সালে জার্মানিতে আধুনিক মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর বই সস্তা ও সহজলভ্য হতে শুরু করে। এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো সম্ভব হয়।১৬শ শতকে ইউরোপের গ্রামার স্কুলগুলোতে বইয়ের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়।মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মিশর ১৮২০ সালে ‘বুলাক প্রেস’ স্থাপনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যবই ব্যবহার শুরু করে।১৯শ শতকে শিল্প বিপ্লবের পর আমেরিকা ও ইউরোপে সরকারগুলো বাধ্যতামূলক বই নির্ভর শিক্ষার আইন করলে পাঠ্যবইয়ের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়।

আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক ১৯২৮ সালে তুরস্কের বই প্রকাশনা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বিশাল বিপ্লব ঘটান। এতে দেশির শিক্ষা হার বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে যোগযোগ মাধ্যমে সহজ হয়।কামাল আতাতুর্কের আমলে ১৯৩২ সালে পবিত্র কোরআনের একটি তুর্কি অনুবাদ প্রথমবার সরকারিভাবে বৃহৎ পরিসরে মুদ্রিত ও বিতরণ করা হয়।এটি ছিল বিশ্বের প্রথম ল্যাটিন অক্ষরে লেখা কোরআন।ভারতীয় উপমহাদেশে মুদ্রণ যন্ত্রের প্রবেশ ঘটে ১৫৫৬ সালে পর্তুগিজদের হাত ধরে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ১৭৭৮ সালে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত বাংলা ব্যাকরণ বইটির মাধ্যমে প্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলা হরফের ব্যবহার শুরু হয় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশে প্রথম ছাপাখানা স্থাপিত হয় রংপুরে ১৮৪৭ সালে।ভালো বই পড়া কেবল শখ নয়, এটি একটি সামগ্রিক ব্যায়াম যা মানুষকে আলোকিত ও সংবেদনশীল করে তোলে।

বিজ্ঞান গবেষণায় বলা হয়েছে প্রতিদিন ভালো ও সঠিক বই পড়লে মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধি পায়: এটি একাগ্রতা বাড়ায় এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ধারালো করে। যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ে: পাঠকদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, যা কথা বলা ও লেখায় প্রভাব ফেলে। মানসিক চাপ কমে: এটি দুশ্চিন্তা দূর করে মনকে এক শান্ত ও কাল্পনিক জগতে নিয়ে যায়।(৪)ঘুমের উন্নতি ঘটে: শোয়ার আগে বই পড়লে দ্রুত ঘুম আসতে সাহায্য করে।(৫)দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়: নতুন নতুন সংস্কৃতি ও জীবনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের উদারতা বৃদ্ধি পায়।আপনি ভবিষ্যতে কেমন মানুষ হবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করে আপনি বর্তমানে কী ধরণের বই পড়ছেন তার ওপর।১৯৯৫ সাল থেকে ইউনেস্কো কর্তৃক প্রতি বছর ২৩ এপ্রিল পালিত হয় ‘বিশ্ব বই দিবস’।

জি,এম,ইশতিয়াক মাহমুদ, শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আদর্শ মুসলিম পাড়া, চাঁদপুর পৌরসভা, চাঁদপুর।

প্রকাশিত :  বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

Views: 3

শেয়ার করুন