বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষ : আহত ২৫ তদন্ত কমিটি গঠন

আনিছুর রহমান সুজন :
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাহকদের হামলায় বিদ্যুৎকর্মীরা আহত হওয়ার ঘটনার জেরে নিরাপত্তাহীনতা ও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ তুলে জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. সাইফুল আলমকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

রোববার (২৯ জুন) দুপুরে ফরিদগঞ্জ জোনাল অফিসে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ২০ থেকে ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী “এক দফা, এক দাবি—ডিজিএমের অপসারণ চাই” স্লোগানে বিক্ষোভে অংশ নেন।

জানা যায়, গত ২৩ জুন উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের উত্তর ধানুয়া গ্রামে অতিরিক্ত লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে চির্কা সাবস্টেশন এলাকা থেকে দুই বিদ্যুৎ কর্মীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর থেকেই এলাকাবাসীর একাংশের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের উত্তেজনা চলছিল।

অভিযোগ রয়েছে, সেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই রোববার সকালে ডিজিএম মো. সাইফুল আলম কোনো ধরনের পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়াই হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এজিএম নাজির উল্লাহর নেতৃত্বে ২০-২৫ সদস্যের একটি দল উত্তর ধানুয়া গ্রামে অভিযান চালায়।

এ সময় গ্রামবাসীর সঙ্গে বিদ্যুৎ কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এতে এজিএম নাজির উল্লাহসহ অন্তত ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত ও লাঞ্ছিত হন বলে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

আন্দোলনরত লাইন টেকনিশিয়ান তহির আহমেদ, লাইনম্যান মমিন, সানোয়ার মোহাম্মদ শুভ, ফেরদাউস খন্দকার, সুজন শেখ, মহন মিয়া, আজহারুল ইসলাম ও শহিদ আলম অভিযোগ করেন, এলাকাটি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তা জেনেও পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়া কর্মীদের সেখানে পাঠানো হয়েছে, যা তাদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ঘটনার প্রতিবাদে তারা ডিজিএমের অপসারণের দাবি জানান।

অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ ভিন্ন। জুয়েল গাজীসহ একাধিক গ্রাহক জানান, গত দুই মাস তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ বিলের কাগজ সরবরাহ করা হয়নি। পরে তিন মাসের বিল একসঙ্গে দিয়ে আগের দুই মাসের বিলের ওপর বিলম্ব ফি আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে আসায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, সংযোগ বিচ্ছিন্নের কারণ জানতে চাইলে বিদ্যুৎ কর্মীরা ফিরোজা বেগম নামে এক নারী গ্রাহকের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধর করেন। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এলাকাবাসী পাল্টা হামলা চালায়।

পরে স্থানীয় সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে বিদ্যুৎ কর্মীরা বিচ্ছিন্ন করা সংযোগ পুনঃস্থাপন করে এলাকা ত্যাগ করেন।

গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম শেখ বলেন, “আমি নিজেও এই অব্যবস্থাপনার ভুক্তভোগী। সাধারণ মানুষকে এভাবে হয়রানি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

অবরুদ্ধ অবস্থায় ডিজিএম মো. সাইফুল আলম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন, “জিএম আসছেন, তিনিই সব বলবেন।”

ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. এরশাদ উল্লাহ বলেন, “ধানুয়া গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে সংঘর্ষের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

খবর পেয়ে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বিকেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং প্রশাসনিক ও আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ফরিদগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে স্থানীয় অনেক বাসিন্দাও দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

 

প্রকাশিত : রোববার, ২৮ জুন ২০২৬ খ্রি
.

Views: 7

শেয়ার করুন