জনতা বাজারের মেলা—উত্ত্যক্ততা, কিশোর গ্যাং ও সমাজের দায়

সম্পাদকীয়: চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার জনতা বাজারে আয়োজিত একটি মেলা সম্প্রতি প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ? অনুমতি ছাড়া আয়োজিত এই মেলায় নারীদের উত্ত্যক্ত করা, অশ্লীল ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি শুধু একটি মেলা বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়—এটি আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।

মেলা বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু কেনাকাটা বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং সামাজিক মিলনমেলা। কিন্তু যখন এই আয়োজনের পেছনে থাকে অনুমতি ছাড়া কার্যক্রম, নিরাপত্তার অভাব, এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ড, তখন তা হয়ে ওঠে বিপর্যয়ের উৎস।

জনতা বাজারের ইসলামিয়া মার্কেট এলাকায় আয়োজিত এই মেলায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নারীদের উত্ত্যক্ত করে, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে ভিডিও ধারণ করে এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এটি শুধু আইন ভঙ্গ নয়, এটি নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার সরাসরি লঙ্ঘন।

বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান নতুন নয়। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই গোষ্ঠীগুলো, যারা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে ভয়, অশ্লীলতা, এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে। জনতা বাজারের ঘটনায় দেখা যায়, এই কিশোররা শুধু উত্ত্যক্ত করেই থেমে থাকেনি—তারা ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দিয়েছে, যা আরও ভয়ংকর।

প্রশ্ন হলো, এই কিশোররা কোথা থেকে এমন আচরণ শিখছে? পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ—সবাই কি ব্যর্থ? নাকি আমরা কেবল চোখ বন্ধ করে চলেছি?

সহকারী কমিশনার (ভূমি) রহমত উল্যাহর নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে মেলা বন্ধ করা এবং আয়োজকদের জরিমানা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এটি দেখায়, প্রশাসন সচেতন এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ধরনের ঘটনা ঘটার আগেই কি প্রতিরোধ করা যেত না?

প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া মেলা আয়োজন করা হয়েছে, অথচ তা চলেছে দিনের পর দিন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, ইউনিয়ন পরিষদ—সবাই কি এই বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন? যদি না-ও থাকেন, তাহলে কেন আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারীরা। একজন গৃহবধূ জানিয়েছেন, তিনি দেশি পণ্য কিনতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন। এমন অভিজ্ঞতা আরও অনেক নারীর হয়েছে। এটি শুধু একটি মেলার সমস্যা নয়—এটি আমাদের সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার সংকট।

নারীদের প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবারে, স্কুলে, সমাজে—নারীদের প্রতি সম্মান শেখাতে হবে। কিশোরদের আচরণ শুধরে দিতে হবে, না হলে তারা ভবিষ্যতের অপরাধী হয়ে উঠবে।

এই ঘটনায় দেখা যায়, কিশোররা ভিডিও ধারণ করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে। এটি প্রযুক্তির অপব্যবহারের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি, কনটেন্ট ফিল্টারিং এবং ডিজিটাল শিক্ষার অভাব আমাদের তরুণদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি—যেখানে তরুণরা বুঝবে কোন কনটেন্ট গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়। প্রযুক্তি যেন মুক্তির পথ হয়, বিপদের নয়।

এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজন—

– নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি: অনুমতি ছাড়া কোনো আয়োজন যেন না হয়।
– শিক্ষা ও সচেতনতা: স্কুল-কলেজে কিশোরদের আচরণগত শিক্ষা দেওয়া।
– পরিবারের ভূমিকা: সন্তানদের আচরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে নজরদারি।
– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ: অশ্লীল কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
– নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: মেলা, বাজার, রাস্তায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি, পুলিশি টহল, এবং হেল্পলাইন চালু করা।

জনতা বাজারের মেলা বন্ধ হওয়া একটি তাৎক্ষণিক সমাধান। কিন্তু এর পেছনের সমস্যাগুলো রয়ে গেছে—কিশোরদের বিপথগামীতা, নারীর নিরাপত্তার সংকট, প্রযুক্তির অপব্যবহার, এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা। এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সমাজের গভীরে কী ধরনের অসুখ বাসা বেঁধেছে।

এখন সময় এসেছে, আমরা শুধু প্রতিক্রিয়া নয়—প্রতিরোধে মনোযোগ দিই। না হলে, আগামীকাল হয়তো আরও একটি মেলা, আরও কিছু নারী, এবং আরও কিছু কিশোর আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

শুক্রবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন
চাঁদপুর রিপোর্ট

Views: 0

শেয়ার করুন