মতলবের মেঘনা-ধনাগোদা নদীতে তীব্র ভাঙন, নেপথ্যে বালু উত্তোলন

সফিকুল ইসলাম রানা
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা ও ধনাগোদা নদীতে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। মেঘনা-ধনাগোদা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতাধীন ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ ঘিরে একাধিক এলাকায় তীব্র ভাঙনে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই ভাঙনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেঘনা নদীর জহিরাবাদ লঞ্চঘাট থেকে সোনারপাড়া-সানকিভাঙ্গা, চরমাছুয়া-জনতার বাজার এলাকা এবং ধনাগোদা নদীর ষাটনল থেকে কালীপুর, নবীপুর-হাফানিয়া-খাগুরিয়া, ঠেটালিয়া-সিপাইকান্দি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নদীভাঙন চলছে। এছাড়া মেঘনার পশ্চিম পাড়ের চরাঞ্চল বোরচর, চরউমেদ ও নাছিরারচর এলাকাতেও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। আমিরাবাদ এলাকায় মেঘনা নদীর পাড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ব্লক ফেলে কাজ শুরু হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদী অঞ্চলে জিও ব্যাক ডাম্পিং করতে দেখা গিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং তীরবর্তী অঞ্চল দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রবল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
ভাঙনের মুখে এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, হাসপাতাল, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নতুন নতুন এলাকায় ফাটল দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন নদীপাড়ের মানুষ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৮৬-৮৭ সালে নির্মিত হয় ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মূল বেড়িবাঁধ। নির্মাণের পর এখন পর্যন্ত দুইবার বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরে সরকারিভাবে মেরামত করা হলেও আবারও নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে প্রকল্পটি।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে স্থায়ীভাবে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে অচিরেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে মতলব উত্তর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ।
কালিপুর বাজার সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুক হোসেন বলেন, নদীর আচমকা ভাঙনে বাজার, বসতবাড়ি, কালিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ফয়েজ আহম্মেদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল হুমকির মুখে পড়েছে। এত দ্রুত ভাঙন হবে আমরা কল্পনাও করিনি।
সোনারপাড়া এলাকার মো. মনির হোসেন খান বলেন, জহিরাবাদ লঞ্চঘাট থেকে উত্তর দিকে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে।
সিপাইকান্দি এলাকার ইউপি সদস্য একেএম গোলাম নবী খোকন জানান, ধনাগোদা নদীর ঠেটালিয়া-সিপাইকান্দি এলাকায় প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ও ব্লক ডাম্পিং হয়েছে। যার ফলে কিছুটা নদী ভাঙ্গন রোধ হয়েছে।
ষাটনল ইউপি চেয়ারম্যান ফেরদাউস আলম সরকার অভিযোগ করে বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণেই ষাটনল, কালিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালুমহালের নামে ইজারা দিয়ে নদীকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। মেঘনা ও ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও ব্লক ডাম্পিং কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। নদী রক্ষা ও ভাঙন প্রতিরোধে প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬ খ্রি.
Views: 3
























