মতলব উত্তরে বাল্যবিবাহে বিপন্ন ভবিষ্যৎ : স্কুলে যাওয়ার বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে

সফিকুল ইসলাম রানা : চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত ইউনিয়নগুলোতে স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের জীবন থমকে যাচ্ছে কৈশোরেই। শিক্ষা, স্বপ্ন ও স্বাভাবিক জীবন—সবকিছু থেমে যাচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে বসার মাধ্যমে।
প্রশাসনের নজরদারি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা হলেও বাস্তবে এর প্রভাব কম। কারণ, অধিকাংশ বাল্যবিবাহই হয় রাতের আঁধারে কিংবা কৌশলে আত্মগোপনে রেখে। বরপক্ষ অনেক সময় দূর এলাকা থেকে এনে কাজ সম্পন্ন করে।
দৈনিক ইত্তেফাকের ২০১৯ সালের ৭ মার্চের প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই উপজেলায় ১২০০-র বেশি স্কুলছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। আর বর্তমান বাস্তবতায় চিত্রটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষকরা।
মতলব উত্তরের জান্নাতুল ফেরদৌসী নারী অধিকার কর্মী বলেন, বাল্যবিবাহ কেবল একটি মেয়ের জীবন থামিয়ে দেয় না, এটি একটি পুরো প্রজন্মকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বপ্নহীনতার দিকে ঠেলে দেয়।
মতলব উত্তর উপজেলার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাকিবুল ইসলাম সোহাগ জানান, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, মা-বাবাকে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সচেতনতা কার্যক্রম, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সক্রিয় ভূমিকা, এবং প্রশাসনের জোরালো হস্তক্ষেপই পারে এই ভয়াবহতা কমাতে।
ষাটনল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম সরকার জানান, আমাদের এলাকায় বাল্যবিবাহ এখন একটা বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অভিভাবকেরা নিরাপত্তা, সামাজিক চাপ কিংবা দরিদ্রতার কারণ দেখিয়ে মেয়েদের ছোট বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। স্থানীয় ইমাম, শিক্ষক, সমাজকর্মীদের যুক্ত করেছি এই কাজে।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু সত্য কথা হলো, অনেক সময় এসব বিয়ের খবর গোপনে রাখা হয়, আমাদের জানানো হয় না। আবার কেউ কেউ আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইরে গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করেন। আমরা চাই, প্রশাসন আরও কঠোর হোক এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ওয়ার্ডভিত্তিক সচেতন নাগরিক কমিটি গঠন করে এই ভয়াবহতা রোধ করা হোক।
নাউরি আহমাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তাইজুল ইসলাম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের অনেক প্রতিভাবান ছাত্রী চুপিসারে বিয়ে হয়ে যায়। আমরা যখন জানতে পারি, তখন কিছু করার থাকে না। অভিভাবকরা অনেক সময় শিক্ষকদেরও জানাতে চান না। সচেতনতা ও প্রশাসনিক নজরদারি জরুরি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলেন, আমরা নিয়মিত শিক্ষকদের মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করতে কাজ করছি। কিন্তু পরিবার, সমাজ এবং প্রশাসনের যৌথ পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। অনেক সময় অভিভাবকরা নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন। এটা অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বাল্যবিবাহ রোধে আমাদের দপ্তর নিয়মিতভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচার, ক্যাম্পেইন এবং স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক সভা করে যাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের মানসিকতা না বদলালে এই সমস্যা সমাধান কঠিন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা আরও জোরালো উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রবিউল হক জানান, বাল্যবিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমাদের কাছে যদি কোনো তথ্য আসে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। কিন্তু অনেক সময় এসব ঘটনা গোপনে সম্পন্ন হয়, ফলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমি এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই—যেখানেই বাল্যবিবাহের চেষ্টা বা প্রস্তুতির খবর পাবেন, সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানান। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, গত পাঁচ মাসে আমি মাত্র দুটি বাল্যবিবাহের ঘটনা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছি। বাস্তবে আরও অনেক ঘটনা ঘটে থাকলেও তা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছায় না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই আমি সকলের প্রতি অনুরোধ জানাই যেখানে বাল্যবিবাহের প্রস্তুতি বা আশঙ্কা রয়েছে, অনুগ্রহ করে আমাদের অবহিত করুন। আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নেব।
তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন কয়েকটি বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তবে কেবল আইনের প্রয়োগেই নয়, সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়িয়ে তবেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বাল্যবিবাহ কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। মতলব উত্তরের বাল্যবিবাহের বর্তমান চিত্র আগামী প্রজন্মের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ ডেকে আনছে। সময় এসেছে সবাই মিলে, প্রশাসন, পরিবার ও সমাজ একসাথে রুখে দাঁড়ানোর। নয়তো, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবার আগেই নিভে যাবে বহু সম্ভাবনার প্রদীপ।
সোমবার, ০৭ জুলাই ২০২৫
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শেয়ার করুন
Views: 0

















