৭০ বছর ধরে ঝুপড়ি ঘরে বন্দি জীবন, প্রতিবন্ধী সাজুর আশ্রয় শুধু ভাই-ভাবি

সফিকুল ইসলাম রানা :

চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মোহনপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে প্রায় ৭০ বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন জন্মগত প্রতিবন্ধী নারী সাজু। জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত তিনি। বয়সের ভার, অসহায়ত্ব এবং চরম দারিদ্র্য মিলিয়ে তার জীবন যেন এক দীর্ঘ কষ্টগাথা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাজু জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি একটি কাঠের খাটেই শুয়ে কাটিয়েছেন। ঘরের বাইরে বের হওয়া তো দূরের কথা, বিছানা থেকেই উঠতে পারে না তিনি। বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন। এরপর থেকে একমাত্র ভাই শামসুল কবিরাজ ও তার স্ত্রী পারুল বেগমই হয়ে উঠেছেন তার ভরসার একমাত্র আশ্রয়।

অভাব-অনটনের সংসার হলেও বোনকে কখনো অবহেলা করেননি শামসুল কবিরাজ। প্রতিদিন তাকে খাওয়ানো, পরিচর্যা করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কাজই করে আসছেন তিনি ও তার স্ত্রী।

সাজুর ভাই শামসুল কবিরাজ বলেন, ছোটবেলা থেকেই বোনকে লালন-পালন করছি। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন তার দায়িত্ব পালন করব। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য খুবই সীমিত। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের সহযোগিতা পেলে বোনের জন্য ভালো কিছু করতে পারতাম।

ভাইয়ের স্ত্রী পারুল বেগম বলেন, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি অনেক আগেই মারা গেছেন। বিয়ের পর এই বাড়িতে এসে ননদকে নিজের বোনের মতোই আগলে রেখেছি। সে এই কাঠের খাট ছাড়া অন্য কোথাও থাকতে পারে না। মাথার নিচে বালিশও দেয় না, কাঠের ওপর মাথা রেখে প্রায় ৭০ বছর ধরে এভাবেই শুয়ে আছে। আমরা গরিব মানুষ, যা পেরেছি তাই দিয়ে তার সেবা করেছি। সরকারের কাছে অনুরোধ, যদি তার থাকার জন্য একটা ভালো ঘর করে দেওয়া হয়, তাহলে জীবনের শেষ সময়টুকু একটু স্বস্তিতে কাটাতে পারবে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সাজু। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে তার জীবনযাত্রার মান কিছুটা হলেও উন্নত হতে পারে।

মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকা এই পরিবারটি এখন সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার অপেক্ষায়। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, সম্মিলিত উদ্যোগে এগিয়ে এলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিবন্ধী সাজু অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয় ও সম্মানজনক জীবন পেতে পারেন।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ বাবুল বেপারী বলেন, আমি মেম্বার থাকাকালে তার জন্য একটি প্রতিবন্ধী কার্ড করে দিয়েছিলাম। ভবিষ্যতে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা গ্রামবাসী মিলে পাশে দাঁড়াব।

এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, আমরা বাহাদুরপুরে প্রায় ৭০ বছর বয়সী একজন প্রতিবন্ধী মহিলার বিষয়ে জানতে পেরেছি। তার নিকটাত্মীয়রা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ভালো বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। বিষয়টি জানার পর আমরা দেখেছি তিনি অত্যন্ত জীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার ঘরটি মেরামত করে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি তার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সহায়তা করা সম্ভব, তা করা হবে।

প্রকাশিত : বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ :
.

Views: 3

শেয়ার করুন