মতলব উত্তরে অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের ছড়াছড়ি

সফিকুল ইসলাম রানা :
নিয়মনীতির তোয়াক্কা ও অনুমোদন ছাড়াই মতলব উত্তর উপজেলায় একের পর এক গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসার নামে এসব প্রতিষ্ঠান রোগী ও স্বজনদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ আইন অমান্য করছে। এ ছাড়াও ভুল পরীক্ষা-চিকিৎসায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।

মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী উপজেলায় বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের সংখ্যা ১৬ টি।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রক্রিয়াধীন। বাকি দশটি চলছে সরকারি লাইসেন্স ছাড়া। এছাড়া অন্তত চারটি প্রতিষ্ঠান আছে যাদের নাম এবং অবস্থান সম্পর্কে জানেন না উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিভিল সার্জন কার্যালয়।

খোজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ছেংগারচর বাজার, ফরাজীকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশেরই কোনো হালনাগাদ লাইসেন্স নেই। এদের মধ্যে ছেংগারচর বাজারের পালস এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মুন মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ডা. কর্নার এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার কোনো বৈধ্য লাইসেন্স ছাড়াই খোলামেলা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এছাড়া ফরাজীকান্দির মোহাম্মদিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মোহনপুর ডিজিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিফাস্ট মেডিকেল সার্ভিস এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং প্রাইম এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ আরও কয়েকটি লাইসেন্স ছাড়া আইন অমান্য করে তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে।

​অন্যদিকে, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে লাইসেন্স প্রক্রিয়াধীন থাকলেও অনুমোদন পাওয়ার আগেই পুরোদমে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে মুন মেডিকেল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, খাজা গরিব নেওয়াজ এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফয়েজ মেমোরিয়াল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুজাতাপুর হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইসলামীয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং নিউ পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ আরও কয়েকটি।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রত্যেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (প্যাথলজিস্ট) পাশাপাশি একজন করে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, রিপোর্ট দানকারী, পরিচ্ছন্নকর্মী এবং ক্লিনিকের ক্ষেত্রে এর বাইরে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকসহ নার্স ও যন্ত্রপাতি থাকা বাধ্যতামূলক। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন বা আয়কর প্রত্যয়নপত্র, নারকোটিক পারমিট (মাদকদ্রব্য ব্যবহারে অনুমতি), ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নম্বর, পরিবেশ ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চুক্তিপত্রসহ বেশকিছু কাগজপত্র এবং অবকাঠামোগত বিষয় থাকতে হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই এসব নেই বলে তাদের লাইসেন্সও নবায়ন হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স নবায়ন না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়মিত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই-একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের কোথাও কোনো প্যাথলজিস্ট নেই। নামে-মাত্র একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দিচ্ছেন। হাতেগোনা দুই-একটি প্রতিষ্ঠান তাদের রিপোর্টে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পাশাপাশি মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর রাখলেও কোনো মেডিকেল অফিসার সেখানে না বসায় ওই অফিসারের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার হচ্ছে।

মতলব উত্তর বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, মতলব উত্তরে বর্তমানে প্রায় ২০টির মতো বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা খুব শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আলোচনা করব। স্বাস্থ্যসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। তাই ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা সিভিল সার্জনের দপ্তরের সব নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্সসহ সব কাগজপত্র হালনাগাদ ও সংরক্ষণ করে নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা উচিত।

এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাস বলেন, মতলব উত্তরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা বাড়লেও সব প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে কিংবা অনুমোদন ও লাইসেন্সের শর্ত না মেনে রোগীদের সেবা দেওয়া হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বিশেষ করে অদক্ষ বা অননুমোদিত জনবল দিয়ে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ না রাখার মতো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডাক্তার মোহাম্মদ নুর আলম দীন জানান, লাইসেন্স ছাড়া কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা হাসপাতাল চালানো যাবে না। যাদের লাইসেন্স আছে কিন্তু নবায়ন করা হয়নি, তাদের দ্রুত নবায়ন করতে হবে। আর যারা শুধু আবেদন করেছেন, লাইসেন্স পাওয়ার আগে তারা কোনো কার্যক্রম চালাতে পারবেন না।

প্রকাশিত :  ‍সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

Views: 5

শেয়ার করুন