মতলব উত্তরে জঙ্গল থেকে অর্ধগলিত নারীর লাশ উদ্ধার: পরিচয় শনাক্তে পিআইবির তদন্ত, এলাকায় চাঞ্চল্য

গোলাম নবী খোকন :

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় একটি জঙ্গল থেকে অর্ধগলিত অবস্থায় অজ্ঞাত এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ২৫ জুন বুধবার সকালে উপজেলার কলাকান্দা ইউনিয়নের হানিরপাড় গ্রামের নির্জন একটি জঙ্গল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ কামারুল হাসান জানান, বুধবার সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে স্থানীয় এক পথচারী হানিরপাড় গ্রামের ওই জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তীব্র দুর্গন্ধ পান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তিনি জঙ্গলের ভেতরে উঁকি দিয়ে অর্ধগলিত একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিয়ে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন।

খবর পেয়ে মতলব উত্তর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে দুপুর ১২টার দিকে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

ওসি কামারুল হাসান বলেন, “মরদেহটি বেশ কয়েকদিনের পুরনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। শরীরের অধিকাংশ অংশ পচে-গলে গেছে। মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে নিহতের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে।”

যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ
প্রত্যক্ষদর্শী পথচারী রহিম মিয়া জানান, “সকালে গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছিলাম। জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেমন পচা গন্ধ নাকে লাগে। কৌতূহল নিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখি মানুষের মতো কিছু পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি একজন মহিলার লাশ। পরে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়।”

স্থানীয় আব্দুল মালেক জানান, হানিরপাড় গ্রামের ওই জঙ্গলটি বেশ ঘন এবং নির্জন। দিনের বেলায়ও মানুষজন কম চলাচল করে। “লাশটা কয়েকদিন আগে এখানে ফেলে গেছে বলে মনে হয়। আমাদের ইউনিয়নে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। আমরা সবাই আতঙ্কিত।”

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি
মতলব উত্তর থানার ওসি কামারুল হাসান আরও জানান, এটি হত্যাকাণ্ড না কি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে পুলিশ এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই সন্দেহ করছে।

“লাশের গায়ে থাকা কাপড়-চোপড় আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামতও সংগ্রহ করা হয়েছে,” বলেন ওসি।

লাশ শনাক্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিআইবি) চাঁদপুর জেলা ইউনিট কাজ শুরু করেছে। পিআইবির একটি চৌকস দল ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে।

পিআইবি চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “মরদেহের অবস্থা খারাপ হওয়ায় আঙুলের ছাপ নেওয়া কঠিন হচ্ছে। আমরা ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। পাশাপাশি নিখোঁজ ডায়েরিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আশপাশের সব থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে।”

এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
হানিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা বলেন, “সকাল থেকে গ্রামের নারীরা আতঙ্কে আছে। কার মেয়ে, কার বোন, কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যেন দ্রুত অপরাধীদের ধরে এবং মেয়েটার পরিচয় বের করে।”

মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এটি অত্যন্ত নৃশংস ঘটনা। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে পুলিশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে গত কয়েকদিনে এলাকায় কোনো নারী নিখোঁজ আছে কি না।”

ঘটনার পর থেকে ওই জঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয়দের অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ জানিয়েছে প্রশাসন।

সম্ভাব্য যেসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ
১. নিখোঁজ ডায়েরি: চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলা নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুরের থানাগুলোতে গত ১৫ দিনে দায়ের হওয়া নারী নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
২. পূর্ব শত্রুতা: নিহতের পরিচয় পাওয়ার পর পারিবারিক বা সামাজিক কোনো শত্রুতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
৩. সিসিটিভি ফুটেজ: হানিরপাড় গ্রামে ঢোকার মূল সড়কগুলোর আশপাশের বাড়ি ও দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
৪. মোবাইল ট্র্যাকিং: ঘটনাস্থলের আশপাশে গত কয়েকদিনে কোন মোবাইল নম্বর সক্রিয় ছিল, তার কললিস্ট বিশ্লেষণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মরদেহের যে অবস্থা, তাতে ধারণা করা যায় ৪ থেকে ৭ দিন আগে মৃত্যু হয়েছে। গরম ও বৃষ্টির কারণে পচন দ্রুত হয়েছে। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর সঠিক কারণ, ধর্ষণের আলামত আছে কি না এবং মৃত্যুর আনুমানিক সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। রিপোর্ট পেতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।”

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনক। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি পুলিশের তদন্তে গতি আনতে হবে। ভিকটিমের পরিচয় গোপন রেখে হলেও যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।”

প্রশাসনের বক্তব্য
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, “ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পুলিশ ও পিআইবি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। তদন্তে কোনো গাফিলতি হবে না।”

চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, “জেলা পুলিশের একটি বিশেষ টিমকে মামলাটি তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্লুলেস এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে আমরা সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করব।”

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়নি এবং কাউকে আটকও করা যায়নি। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ সন্দেহভাজনদের শনাক্তে স্থানীয় সোর্স নিয়োগ করেছে।

এলাকাবাসী দ্রুত ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। কেউ যদি নিহত নারীর পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন, তবে মতলব উত্তর থানা অথবা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ খ্রি
.

Views: 7

শেয়ার করুন